ত্রিপুরায় PRTC সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া
ত্রিপুরা ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য। রাজ্যের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য সরকারি নথিপত্র অত্যন্ত জরুরি, যার মধ্যে অন্যতম হলো PRTC বা Permanent Resident of Tripura Certificate। এই সার্টিফিকেট একজন নাগরিকের স্থায়ীভাবে ত্রিপুরা রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণস্বরূপ ব্যবহৃত হয়। সরকারী চাকরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বৃত্তি, জমি রেজিস্ট্রি বা অন্যান্য অনেক সরকারি কাজে এই সার্টিফিকেট অত্যাবশ্যক।
এই প্রবন্ধে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো – PRTC কী, কেন দরকার, কারা আবেদন করতে পারবেন, কোন কোন কাগজপত্র প্রয়োজন, কোথায় এবং কিভাবে আবেদন করতে হয়, অনলাইন ও অফলাইন উভয় প্রক্রিয়া, আবেদন ফি, সময়সীমা এবং প্রাপ্তির পরবর্তী ব্যবহার।
১. PRTC সার্টিফিকেট কী?
PRTC অর্থাৎ Permanent Resident of Tripura Certificate হলো একটি সরকারী নথি যা প্রমাণ করে যে আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাস করছেন এবং তিনি এই রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা। এটি সাধারণত জেলা প্রশাসন বা রাজ্যের রাজস্ব দপ্তরের মাধ্যমে ইস্যু করা হয়।
২. PRTC কেন দরকার?
PRTC বিভিন্ন ক্ষেত্রে আবশ্যক –
- সরকারি চাকরি – ত্রিপুরা সরকারের চাকরির আবেদন করতে গেলে প্রার্থীর PRTC জমা দিতে হয়।
- শিক্ষা – কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, বৃত্তি প্রাপ্তি, রিজার্ভেশন সুবিধা পেতে PRTC লাগে।
- আইনি কাজ – জমি ক্রয়-বিক্রয়, হোল্ডিং নাম পরিবর্তন, ব্যাংক সংক্রান্ত কাজে এই নথি ব্যবহৃত হয়।
- পরিচয় প্রমাণ – ভোটার আইডি, আধার, রেশন কার্ড বা অন্য কোনো সরকারি নথির সাথে মিলিয়ে PRTC একজনের বাসিন্দা পরিচয় নিশ্চিত করে।
৩. কারা আবেদন করতে পারবেন?
ত্রিপুরা সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা PRTC-এর জন্য আবেদন করতে পারবেন –
- যিনি জন্মসূত্রে ত্রিপুরার নাগরিক।
- যিনি অন্তত ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ত্রিপুরায় বসবাস করছেন।
- সরকারি চাকরির কারণে যিনি অন্যত্র বসবাস করলেও তার স্থায়ী বাসস্থান ত্রিপুরা।
- নাবালক সন্তান – যাদের পিতা বা মাতা ত্রিপুরার স্থায়ী বাসিন্দা।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
PRTC-এর জন্য আবেদন করতে নিম্নলিখিত নথিগুলি জমা দিতে হয় –
- আবেদন ফর্ম – নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হবে।
- পরিচয় প্রমাণপত্র – ভোটার আইডি, আধার কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স।
- বাসস্থান প্রমাণপত্র – বিদ্যুৎ বিল, রেশন কার্ড, হোল্ডিং নম্বর, জমির দলিল।
- জন্ম সনদ বা শিক্ষাগত প্রমাণপত্র (ত্রিপুরায় জন্ম/শিক্ষার প্রমাণ দিতে)।
- পিতা-মাতা/স্বামীর PRTC (যদি আগে থাকে)।
- অ্যাফিডেভিট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
৫. আবেদন করার প্রক্রিয়া
PRTC-এর জন্য আবেদন করার দুটি উপায় আছে –
ক) অফলাইন প্রক্রিয়া
- প্রথমে সংশ্লিষ্ট SDM অফিস (Sub-Divisional Magistrate Office) অথবা DM অফিস (District Magistrate Office)-এ যান।
- PRTC আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করুন।
- ফর্মে নাম, জন্মতারিখ, পিতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য পূরণ করুন।
- প্রয়োজনীয় নথির ফটোকপি ও ছবি সংযুক্ত করুন।
- ফর্ম জমা দেওয়ার পর একটি রিসিপ্ট/আবেদন নম্বর পাবেন।
- তদন্ত শেষে ও সকল নথি যাচাই করার পর PRTC ইস্যু করা হয়।
খ) অনলাইন প্রক্রিয়া
ত্রিপুরা সরকার e-District Tripura Portal-এর মাধ্যমে অনলাইন আবেদন গ্রহণ করে।
- প্রথমে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যান: https://edistrict.tripura.gov.in
- Citizen Login অপশনে গিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার করুন।
- লগইন করার পর Apply for Certificates → Permanent Resident Certificate (PRTC) সিলেক্ট করুন।
- অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণ করুন এবং প্রয়োজনীয় নথির স্ক্যান কপি আপলোড করুন।
- অনলাইন ফি (যদি প্রযোজ্য হয়) পেমেন্ট করুন।
- আবেদন জমা দিলে একটি Acknowledgement Number পাওয়া যাবে।
- আবেদনটির স্ট্যাটাস অনলাইনে ট্র্যাক করা যায়।
- যাচাই সম্পন্ন হলে PRTC ডাউনলোড করা যাবে অথবা অফিস থেকে সংগ্রহ করা যাবে।
৬. ফি এবং সময়সীমা
- সাধারণত PRTC সার্টিফিকেটের জন্য ₹৫ থেকে ₹৫০ টাকার মধ্যে ফি নির্ধারিত হয় (জেলার ভিত্তিতে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে)।
- সাধারণ সময়সীমা ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস। তবে সব নথি সঠিক থাকলে দ্রুত সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।
৭. যাচাই ও তদন্ত প্রক্রিয়া
PRTC ইস্যু করার আগে স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা, পঞ্চায়েত সচিব, বা Ward Officer দ্বারা আবেদনকারীর বসবাস ও নথি যাচাই করা হয়। প্রয়োজন হলে পুলিশ ভেরিফিকেশনও হতে পারে। যাচাই শেষে রিপোর্ট ইতিবাচক হলে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়।
৮. সার্টিফিকেট প্রাপ্তির পরবর্তী ব্যবহার
PRTC হাতে পাওয়ার পর এটি –
- সরকারি চাকরির আবেদনে সংযুক্ত করতে হবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা বৃত্তির জন্য জমা দিতে হবে।
- জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নথিতে ব্যবহার করা যায়।
- ভবিষ্যতে অন্য যে কোনো সরকারি কাগজপত্র তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
৯. সাধারণ সমস্যার সমাধান
- নথি অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে। তাই সব কাগজপত্র আগে থেকে ঠিকভাবে প্রস্তুত রাখুন।
- ভুল তথ্য দিলে তদন্তে ধরা পড়লে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে।
- অনলাইন আবেদন করলে স্ক্যান কপির সাইজ ও ফরম্যাট (JPEG/PDF) ঠিক রাখতে হবে।
- সার্টিফিকেট হাতে না পেলে SDM অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
ত্রিপুরায় PRTC সার্টিফিকেট একজন নাগরিকের স্থায়ী বাসিন্দা পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি। এটি ছাড়া সরকারি চাকরি, শিক্ষাবৃত্তি বা জমি রেজিস্ট্রি করা কঠিন। তাই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা দরকার। আজকের ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্রক্রিয়ার কারণে আবেদন করা অনেক সহজ হয়েছে।
Share this content: