মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস

মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস

১. ভূমিকা

ত্রিপুরা রাজ্যের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্থান হলো মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির। এটি রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে উনকোটি জেলার উদয়পুর শহরে অবস্থিত। দেবী ত্রিপুরেশ্বরী বা ত্রিপুরাসুন্দরী হিন্দুধর্মের অন্যতম দশ মহাবিদ্যার একটি রূপ। তাঁর এই মন্দিরকে শুধু রাজ্যের নয়, সমগ্র উত্তর–পূর্ব ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ হিসেবে মানা হয়। লোকবিশ্বাস, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং রাজ্যরাজড়াদের সঙ্গে জড়িত নানা কাহিনি এই মন্দিরকে এক বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছে।


২. পৌরাণিক প্রেক্ষাপট

দেবী ত্রিপুরেশ্বরীকে শক্তির অন্যতম রূপ বলা হয়। পুরাণে উল্লেখ আছে যে সতী দেবীর শরীর খণ্ডিত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পতিত হয় এবং সেই স্থানগুলো শক্তিপীঠ নামে পরিচিত হয়। বিশ্বাস করা হয়, ত্রিপুরার এই স্থানে সতীর ডান পা পতিত হয়েছিল। সেই থেকেই এখানে দেবী ত্রিপুরেশ্বরী স্থাপিত হন। দেবীর প্রধান প্রতীক রূপে দেখা যায় একটি কৃষ্ণবর্ণের কোষ্ঠকপাটাকার পাথরের প্রতিমা, যার ভেতরে মহাশক্তির প্রকাশ ঘটেছে বলে ভক্তরা মনে করেন।


৩. মন্দির প্রতিষ্ঠা

ইতিহাস অনুযায়ী, ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মা ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শোনা যায়, তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন দেবীর কাছ থেকে। সেই আদেশ অনুসারেই তিনি বর্তমান উদয়পুরে এই শক্তিপীঠ নির্মাণ করেন। প্রাচীনকালে এই স্থানের নাম ছিল মাতাবাড়ি, যা আজও প্রচলিত।

মন্দির স্থাপত্য মূলত বাঙালি ও কেরলীয় শৈলীর মিশ্রণ। এতে দেখা যায় অষ্টকোণ ভিত্তি, সুউচ্চ শিখর, গর্ভগৃহ ও প্রশস্ত অঙ্গন। এই স্থাপত্যরীতি উত্তর-পূর্ব ভারতের মন্দির সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত।


৪. দেবীর রূপ ও প্রতিমা

মা ত্রিপুরেশ্বরীর প্রতিমা অনন্য। এটি একটি পাথরের খণ্ড থেকে গড়া, যেখানে দেবীর মুখমণ্ডল শান্ত, গম্ভীর ও অতুলনীয়। দেবীকে এখানে চতুর্ভুজা রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এক হাতে ত্রিশূল, এক হাতে চক্র, অন্য হাতে খড়্গ এবং শেষ হাতে শঙ্খ রয়েছে। দেবী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে বিরাজমান হলেও ত্রিপুরেশ্বরী নামে তাঁকে মাতৃস্বরূপা, রক্ষাকর্ত্রী এবং শক্তির আধার হিসেবে পূজা করা হয়।


৫. ধর্মীয় গুরুত্ব

১. শক্তিপীঠ: এই মন্দির ভারতের ৫১ শক্তিপীঠের একটি।
২. দশ মহাবিদ্যা: দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী মহাবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্রেও এ স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
৩. তন্ত্রসাধনা কেন্দ্র: মধ্যযুগ থেকে এটি তন্ত্রসাধকদের একটি মূল কেন্দ্র। এখনও বহু সাধক এখানে এসে সাধনা করেন।


৬. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ত্রিপুরার রাজারা সর্বদা এই মন্দিরকে তাঁদের রাজধর্মের মূল অংশ হিসেবে দেখেছেন। ধর্মমাণিক্যের পরবর্তী রাজারা নিয়মিতভাবে এখানে পূজা, অনুদান ও উৎসব আয়োজন করতেন। বহু প্রাচীন তাম্রলিপি ও দলিল থেকে জানা যায় যে মন্দিরের পূজা–অর্চনা নির্বিঘ্নে চালানোর জন্য রাজারা জমি, অর্থ ও নানা সামগ্রী দান করেছিলেন।


৭. রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা

ত্রিপুরার মণিক্য রাজবংশের সঙ্গে এই মন্দিরের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রতিটি রাজা তাঁদের রাজ্যাভিষেকের সময় মাতাবাড়িতে পূজা দিতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, দেবীর আশীর্বাদ ব্যতীত রাজ্য শাসন সম্ভব নয়। এই মন্দির রাজাদের আধ্যাত্মিক শক্তি ও রাজকীয় বৈধতার প্রতীক ছিল।


৮. উৎসব ও আচার–অনুষ্ঠান

১. দুর্গাপূজা: এখানে দুর্গাপূজাকে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। প্রচুর ভক্ত সমাগম ঘটে।
2. দীপাবলি: দীপাবলি উপলক্ষে বিশেষ তন্ত্রসাধনা ও পূজা হয়।
3. বার্ষিক মেলা: মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতিবছর এক বিশাল মেলা বসে, যেখানে সারা দেশ থেকে মানুষ আসেন।
4. দৈনন্দিন পূজা: প্রতিদিন ভোর থেকে রাত অবধি বিভিন্ন আরতি, ভোগ ও প্রসাদ বিতরণ চলে।


৯. লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তি

১. মাতাবাড়ির অলৌকিকতা: বিশ্বাস করা হয়, মা ত্রিপুরেশ্বরী ভক্তদের সমস্ত দুঃখ–কষ্ট দূর করেন।
২. অগ্নিপরীক্ষা কাহিনি: জনশ্রুতি আছে যে মন্দিরের প্রাচীনকালে আগুন লেগে যায়, কিন্তু দেবীর প্রতিমা অক্ষত থাকে।
৩. রাজাদের স্বপ্নাদেশ: অনেক রাজা দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী নানা সংস্কার করেন।


১০. স্থাপত্য বিশ্লেষণ

মন্দিরটি লাল ও সাদা রঙে সজ্জিত। এর উচ্চ শিখর কেরলীয় গম্বুজাকৃতি, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে বিশেষত্ব লাভ করেছে। গর্ভগৃহ ছোট হলেও গম্ভীর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন, যাতে দেবীর অলৌকিকতা আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। চারপাশে প্রশস্ত অঙ্গন রয়েছে, যেখানে ভক্তরা বসে পূজা–অর্চনা করেন।


১১. আধুনিক প্রেক্ষাপট

আজকের দিনে ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও প্রসিদ্ধ। রাজ্য সরকার ও মন্দির কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এখানে আধুনিক সুবিধা, যাত্রী নিবাস, তথ্যকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে। প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী এখানে আসেন।


১২. সাংস্কৃতিক প্রভাব

ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতিতে দেবী ত্রিপুরেশ্বরীর প্রভাব গভীর। লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য ও গল্পে দেবীর মাহাত্ম্য বারবার উচ্চারিত হয়। মা ত্রিপুরেশ্বরীর গান, ভজন এবং কীর্তনে তাঁর মহিমা গাওয়া হয়। ত্রিপুরার হিন্দু সমাজে প্রতিটি বড় উৎসবে এই মন্দিরের নাম স্মরণ করা হয়।


১৩. আঞ্চলিক ঐক্য

ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির শুধু হিন্দু নয়, অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষকেও আকর্ষণ করে। বহু মুসলিম, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মাতাবাড়ির মেলায় যোগ দেন। এটি আঞ্চলিক ঐক্যের এক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।


১৪. সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য

মন্দিরটি ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ দপ্তর (ASI)-এর তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। এর ভেতরে বহু প্রাচীন শিলালিপি, মূর্তি ও নিদর্শন রয়েছে। এগুলি গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


১৫. উপসংহার

মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি, রাজকীয় ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে এক মহামূল্যবান শক্তিপীঠ। এটি কেবলমাত্র ভক্তি–বিশ্বাসের স্থান নয়, বরং ত্রিপুরার অতীত–বর্তমান–ভবিষ্যতের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতীক। দেবী ত্রিপুরেশ্বরী শক্তির প্রতিরূপ, মাতৃস্বরূপা ও ত্রাণকর্ত্রী হিসেবে আজও অগণিত ভক্তের কাছে আশার আলো হয়ে বিরাজ করছেন।

 

Share this content:

মা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top